মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী ::
দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়ন। মানচিত্রে এটি একটি প্রশাসনিক ইউনিট হলেও গত কয়েক বছর ধরে এখানকার অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের কাছে এর পরিচয় ‘এক উন্মুক্ত বন্দিশালা’। লাফার্জহোলসিম (লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট) কারখানার চুনাপাথর আমদানির জন্য ব্যবহৃত ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ কনভেয়ার বেল্টটি এখন এখানকার কয়েক হাজার মানুষের জন্য অভিশাপ। বিকট যান্ত্রিক শব্দে কালাপশী, শ্যামারগাঁও, রগারপাড়, তেরাপুর, উত্তর নেতরছই, চারওয়াদ্দী, শ্রীপুর আংশিক, পূর্ব ঘিলাতলী, বাংলাবাজার ইউনিয়নের রামশায়ের গাঁও, মির্ধারপাড়া, ঘিলাতলী আংশিকসহ আশপাশের জনপদ এখন যন্ত্রের গর্জনে প্রকম্পিত। মেঘালয় থেকে চুনাপাথর কারখানায় পৌঁছানোর জন্য লাফার্জের এই সুদীর্ঘ কনভেয়ার বেল্টটি গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে চলে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেল্টটি যখন চালু হয়, তখন সংলগ্ন এলাকায় স্বাভাবিক আলাপ-চারিতাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আধুনিক শিল্পায়নের যুগে এ ধরনের ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমে ‘সাউন্ড ইনসুলেশন’ বা শব্দরোধী আবরণ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দোয়ারাবাজারে এই বেল্টটি বছরের পর বছর কোনো কার্যকর শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা ছাড়াই চলছে। ফলে ১০টি গ্রামের মানুষের কানে সার্বক্ষণিক হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ বিঁধছে। শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করলে দেখা যায়, এই এলাকায় শব্দের মাত্রা অনুমোদিত সীমার কয়েক গুণ বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ ডেসিবেলের বেশি শব্দে দীর্ঘক্ষণ থাকলে মানুষের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও অনিদ্রা এখন এই ১০ গ্রামের মানুষের সাধারণ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এলাকাজুড়েই মানসিক চাপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি এক ধরনের সাইলেন্ট হেলথ ডিজাস্টার। শ্যামারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আব্বাস উদ্দীন জানান, আগে সব শুনতাম, এখন কানে সবসময় ভোঁ-ভোঁ শব্দ লাগে। বেল্টের শব্দের কারণে বেল্টের আশপাশ এলাকার মানুষ একে অপরের মধ্যে জোরে কথা বলতে হয়। রগারপাড় গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা ইউনুস আলী জানান, কনভেয়ার বেল্টের প্রচ- শব্দে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিশুদের ওপর। শ্যামারগাঁও গ্রামের এক স্কুল শিক্ষক জানান, যখন বেল্ট চলে, তখন ক্লাসে কথা বলা যায় না। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। রাতে যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার সময়, তখনই শুরু হয় এই শব্দসন্ত্রাস। উল্লেখ্য, লাফার্জহোলসিম (সুরমা সিমেন্ট) একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবেশগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) বড় বড় কথা বললেও, স্থানীয়দের এই আর্তনাদ তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। পরিবেশ আইন ও শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় শব্দের মানমাত্রা লঙ্ঘনের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান থাকলেও এখানে আইনের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে পুরো কনভেয়ার বেল্টটি শব্দরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এছাড়া মেকানিক্যাল পার্টসগুলোতে অত্যাধুনিক সাইলেন্সার ব্যবহার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোতে নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যা¤প ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এটা আমাদের জন্য ভালো, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান যদি ১০টি গ্রামের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, তবে তা কি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন? লাফার্জ কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এই নীরবতা কি কোনো বড় ধরনের সামাজিক বিস্ফোরণের অপেক্ষা করছে? দোয়ারাবাজারের ১০ গ্রামের মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস প্রশাসনের কানে পৌঁছাবে কি? এমন প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে এখন জনমনে। উপজেলার নরসিংপুর ইউপি চেয়ারম্যান নুর উদ্দিন বলেন, বেল্ট স্থাপনের শুরু থেকেই এলাকাবাসী শব্দদূষণ প্রতিরোধে দাবি জানিয়ে আসছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে একের পর এক গ্রাম জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, লাফার্জ কনভেয়ার বেল্টের শব্দ দূষণের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ কর্মকর্তাকেকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট লিমিটেড-এর হেড অফ কমিউনিকেশনস তৌহিদউল ইসলাম জানিয়েছেন, পুরনো বেল্ট পরিবর্তন করে নতুন বেল্ট স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে এবং স্থায়ীভাবে কনভেয়ার বেল্টের শব্দরোধী ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে দুই কিলোমিটার শব্দরোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ কোম্পানি গ্রহণ করেছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
লাফার্জ হোলসিম কোম্পানির শব্দদূষণ কনভেয়ার বেল্টের শব্দে অতিষ্ঠ ১০ গ্রামের মানুষ
- আপলোড সময় : ০৬-০১-২০২৬ ০৮:৫৩:১৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৬-০১-২০২৬ ০৮:৫৭:০৮ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দোয়ারাবাজার প্রতিনিধি